অনলাইন ডেস্ক
সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬ প্রিন্ট ১৮ বার পঠিত
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়েছে জাতিসংঘ। বাড়তি এ সময়কে অর্থনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, আগামী তিন বছরে বাংলাদেশকে একসঙ্গে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। এগুলো হলো এলডিসি উত্তরণের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার করা। এ লক্ষ্য অর্জনে বড় ধরনের সংস্কারের পাশাপাশি উত্তরণ-সংক্রান্ত কর্মসূচি জাতীয় সংসদে আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি।
গতকাল রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ: জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ও আমাদের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক সংবাদ সংলাপে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন বক্তারা।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) সদস্য ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের নির্ধারিত সূচকগুলোতে প্রয়োজনীয় মানদণ্ডের চেয়ে এগিয়ে থাকার পরও বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ব্যতিক্রমী। দেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলো তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও রাজনৈতিক পরিবর্তন, অর্থনীতির বিদ্যমান দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অভিঘাত মোকাবেলার সক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়গুলো সময় বাড়ানোর আবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, বাড়তি তিন বছর কেবল সময়ক্ষেপণের সুযোগ নয়, বরং অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করা না গেলে উত্তরণের প্রস্তুতি যেমন বাধাগ্রস্ত হবে, তেমনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, আগামী তিন বছরে বাংলাদেশকে তিনটি পরস্পরসম্পর্কিত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। প্রথমত, উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। তৃতীয়ত, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ফিরিয়ে আনা।
এসব লক্ষ্য অর্জনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, সুদের হার কমানো, রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং ব্যাংক খাতে সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান উন্নয়ন ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, চ্যালেঞ্জগুলো আলাদা করে মোকাবেলার সুযোগ নেই। সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
এলডিসি উত্তরণকে টেকসই করতে চারটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংস্কারের সুপারিশ করেন এ অর্থনীতিবিদ। এগুলো হলো সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি, সামাজিক সুরক্ষা এবং সরবরাহ ব্যবস্থা। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য এখন সংস্কারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন না হলে জাতিসংঘের কাছে দেশের অঙ্গীকার ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
তাঁর মতে, এসব খাতে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা সম্ভব হলে তৈরি পোশাকশিল্পের বাইরে রফতানি বহুমুখীকরণের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে দেশের উৎপাদনশীলতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও বাড়বে।
অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের কর্মসূচি শুধু আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। এসব বিষয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন, যাতে সব পক্ষের অংশগ্রহণে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি হয়। উত্তরণ-সংক্রান্ত বিষয় মন্ত্রিপরিষদের আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য জবাবদিহির আওতায় আনার পরামর্শ দেন তিনি।
সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা ও নীতিমালা প্রণয়নে দক্ষতা দেখালেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকছে বলে মন্তব্য করেন এ অর্থনীতিবিদ। উদাহরণ হিসেবে রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রথম তিন মাসের রাজস্ব আদায়ের চিত্র পর্যালোচনা করলে বছর শেষে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি থাকার আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে। তাঁর মতে, পরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সংলাপে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ। তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। বিষয়গুলো পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
তিনি আরও বলেন, সরকারের চলমান সংস্কার কার্যক্রম যথাযথভাবে ও নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন করা গেলে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। তবে এজন্য সুস্পষ্ট রোডম্যাপ, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণ এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ জরুরি। সরকারের বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাবের সঙ্গে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির অনেক বিষয়ের মিল রয়েছে। ফলে সমন্বিতভাবে এবং সঠিক সময়ে উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রতিশ্রুতিকে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শুধু উত্তরণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করাই যথেষ্ট নয়; ২০২৯ সালের পরও কীভাবে এ অর্জন টেকসই রাখা যায়, সেই প্রস্তুতি নিতে হবে। একই সঙ্গে উত্তরণ প্রক্রিয়াকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে, যাতে উন্নয়নের সুফলে সমাজের সব পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।
সংলাপে আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খানসহ সংস্থাটির গবেষণা দলের সদস্যরা।
সব মিলিয়ে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর বাড়ানো বাংলাদেশের জন্য যেমন বাড়তি প্রস্তুতির সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি অর্থনীতির বিদ্যমান দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার চাপও বাড়িয়েছে। এ সময়ের মধ্যে রাজস্ব, ব্যাংকিং, জ্বালানি ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে কাঠামোগত সংস্কার এবং বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি করা না গেলে উত্তরণের পর নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। তাই বাড়তি তিন বছরকে শুধু সময়ের সুযোগ হিসেবে নয়, অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদরা।
Posted ১২:২০ অপরাহ্ণ | সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | Animator Alif
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com
✎ মন্তব্য করুন